১৯৪৩-এর মন্বন্তর—ক্ষুধায় মৃত্যু আর সাম্রাজ্যের নির্মম নীরবতা
১৯৪৩-এর মন্বন্তর—ক্ষুধায় মৃত্যু আর সাম্রাজ্যের নির্মম নীরবতা
পশ্চিমবঙ্গরাজনীতিদেশ


১৯৪৩-এর মন্বন্তর—ক্ষুধায় মৃত্যু আর সাম্রাজ্যের নির্মম নীরবতা
১৯৪৩ সালের বঙ্গীয় মন্বন্তর শুধু একটি দুর্ভিক্ষ ছিল না; এটি ছিল শাসনের ব্যর্থতা, উদাসীনতা এবং উপনিবেশিক নীতির নির্মম পরিণতির এক ভয়াবহ উদাহরণ। বাংলার পথে পথে তখন পড়ে থাকত কঙ্কালসার দেহ, ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ ভেঙে পড়ত রাস্তার ধারে, অসহায় মা তার সন্তানের মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দিতে না পেরে চোখের সামনে মৃত্যুর দিকে যেতে দেখতেন। ইতিহাস সাক্ষী—এমন দৃশ্য কোনো সভ্য সমাজের লজ্জা হওয়ার কথা, কিন্তু তখনকার শাসকেরা সেই লজ্জা অনুভব করার প্রয়োজনও বোধ করেননি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অজুহাতে ব্রিটিশ সরকার ভারতের খাদ্য ও পরিবহন ব্যবস্থাকে যুদ্ধের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল। বাংলায় ‘ডিনায়াল পলিসি’-র নামে নৌকা ও খাদ্য সরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে সম্ভাব্য জাপানি আক্রমণ ঠেকানো যায়। কিন্তু এই নীতির ফলে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়ে, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে যায়, আর তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে—ক্ষুধায়, রোগে, অপুষ্টিতে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ভূমিকা নিয়ে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, দুর্ভিক্ষের সময় ভারত থেকে খাদ্য অন্যত্র পাঠানো হচ্ছিল, অথচ বাংলায় মানুষ অনাহারে মরছিল। চার্চিলের কিছু মন্তব্য, যেখানে ভারতীয়দের প্রতি অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যের সুর ছিল বলে বহু গবেষক দাবি করেছেন, সেই সময়ের শাসকশ্রেণির মানসিকতাকেই স্পষ্ট করে দেয়। একটি উপনিবেশের মানুষের জীবন তাদের কাছে কতটা তুচ্ছ ছিল, মন্বন্তরের ইতিহাস তার নির্মম প্রমাণ।
এ কথা ঠিক যে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি জটিল ছিল, কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে—যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় মরছে, তখন দ্রুত ত্রাণ, খাদ্য বণ্টন ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ কেন নেওয়া হল না? কেন বাজারে মজুতদারি চলল, কেন প্রশাসন এত দেরিতে নড়েচড়ে বসল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও ইতিহাসের কাছে ঋণ হয়ে রয়েছে।
১৯৪৩-এর মন্বন্তর আমাদের শুধু অতীতের এক করুণ অধ্যায় শোনায় না, এটি আমাদের সতর্ক করে দেয়—যে শাসন মানুষের জীবনের চেয়ে নীতি, যুদ্ধ বা ক্ষমতাকে বড় করে দেখে, সেই শাসন শেষ পর্যন্ত মানবতার বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়। বাংলার সেই কঙ্কালসার মানুষগুলোর নীরব মৃত্যু আজও ইতিহাসের বুক চিরে একটাই প্রশ্ন তোলে: শাসকের উদাসীনতা কি কখনও ক্ষমাযোগ্য হতে পারে?
