বলিউড ও হিন্দি সিরিয়ালের হাত ধরে বাঙালির ঘরেও এখন পালিত হয় ধনতেরাস


সারা দেশে যখন দীপাবলিতে লক্ষ্মীপূজা হয় বাঙালি সেই সময়ে কালীপুজো করে। কিন্তু আর পাঁচটা জিনিসের মতো এখানেও বলিউড ও হিন্দি সিরিয়ালের রাস্তা দিয়ে অবাঙালি সস্কৃতি ঢুকে পড়েছে। ধনতেরাসের দিন সোনার দোকানে না গেলেও হাতে করে একটা ঝাঁটা অন্তত নিয়ে আসতেই হয়।
ধনতেরাস পালন করা হয় কেন?
একআধটা নয়। এর পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। দীপাবলীর সময় লক্ষ্মীপুজো। আর তার দিন দুই আগে ধনতেরাস হয়। বলা হয়, ধনতেরাসের দিন দেবী লক্ষ্মী তার ভক্তদের গৃহে যান ও তাঁদের ইচ্ছাপূরণ করেন।
সম্পদের দেবতা কুবেরও এ দিন পূজিত হন।
কথিত আছে, রাজা হিমার ১৬ বছরের ছেলের এক অভিশাপ ছিল। যে, বিয়ের চার দিনের মাথায় সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হবে। তার স্ত্রীও জানত সেই কথা। তাই সেই অভিশপ্ত দিনে সে তার স্বামীকে সে দিন ঘুমোতে দেয়নি। শোয়ার ঘরের বাইরে সে সমস্ত গয়না ও সোনা-রূপার মুদ্রা জড়ো করে রাখে। সেই সঙ্গে সারা ঘরে বাতি জ্বালিয়ে দেয়। স্বামীকে জাগিয়ে রাখতে সে সারারাত তাকে গল্প শোনায়, গান শোনায়। পরের দিন যখন মৃত্যুর দেবতা যম তাদের ঘরের দরজায় আসে, আলো আর গয়নার জৌলুসে তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে যায়। রাজপুত্রের শোয়ার ঘর পর্যন্ত তিনি পৌঁছন ঠিকই। কিন্তু সোনার উপর বসে গল্প আর গান শুনেই তাঁর সময় কেটে যায়। সকালে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে যান তিনি। রাজপুত্রের প্রাণ বেঁচে যায়। পরদিন সেই আনন্দে ধনতেরাস পালন শুরু হয়।
কথিত আছে, দুর্বাসা মুনির অভিশাপে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন লক্ষ্মী। সাগরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি। এর পরে অসুরদের সঙ্গে লড়াই করে, সমুদ্রমন্থনের হাত ধরে দেবতারা ফিরে পান লক্ষ্মীকে।
এই ধনতেরাস সমুদ্র মন্থনের সময় হাতে অমৃত কলস নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান ধন্বন্তরি, যিনি শ্রীহরির অংশাবতার।
রাজা বলির ভয় থেকে দেবতাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য বিষ্ণু বামন অবতার নেন। এর পর তিনি বলির যজ্ঞস্থলে পৌঁছন। কিন্তু সেখানে উপস্থিত অসুরদের গুরু শুক্রাচার্য বামন রূপী বিষ্ণুকে চিনে ফেলেন। রাজা বলিকে শুক্রাচার্য সাবধান করে বলেন যে, বামন রূপে বিষ্ণু সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। তাই বামন যা চাইবে, তা যেন দেওয়া না-হয়। কারণ বামন রূপী বিষ্ণু দেবতাদের সহায়তার জন্য সেখানে প্রকট হয়েছেন। কিন্তু শুক্রাচার্যের কথা অমান্য করে বামনরূপী হরির প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে বামনের তিন পা সমান ভূমি দান করতে রাজি হয়ে যান। শুক্রাচার্য এই দান ভেস্তে দেওয়ার জন্য লঘু রূপ ধারণ করে বিষ্ণুর কমণ্ডুলুতে প্রবেশ করেন। বামনও শুক্রাচার্যের ছল বুঝতে পেরে নিজের হাতে থাকা কুশকে কমুণ্ডুলুতে এমন ভাবে প্রবেশ করান, যার ফলে শুক্রাচার্যের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। এরপর বলি বামনকে তিন পা সমান জমি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। বামন নিজের একটি পা দিয়ে সম্পূর্ণ পৃথিবী ও অপর পা দিয়ে অন্তরীক্ষ মেপে নেন। কিন্তু তৃতীয় পা রাখার জন্য কোনও স্থান বেঁচে না-থাকার কারণে রাজা বলি নিজের মস্তক বামন রূপী বিষ্ণুর পায়ের তলায় রেখে দেন। এ ভাবে দেবতারা বলির ভয় থেকে মুক্তি পায়। এই জয়ের উৎসব হিসেবে ধনতেরাস পালিত হয়।
এক সময় বিষ্ণু মৃত্যুলোকে বিচরণ করতে এলে, লক্ষ্মীও তাঁর সঙ্গ নেন। তখন বিষ্ণু বলেন, তাঁর কথা মেনে চললে লক্ষ্মী তাঁর সঙ্গে যেতে পারেন। তাঁর কথা মান্য করে লক্ষ্মী বিষ্ণুর সঙ্গে পৃথিবীতে আসেন। একটি স্থানে এসে বিষ্ণু লক্ষ্মীকে অপেক্ষা করতে বলেন। বলেন, তিনি দক্ষিণ দিকে যাচ্ছেন এবং তাঁর না-আসা পর্যন্ত লক্ষ্মী যেন সেখান থেকে কোথাও না যান। লক্ষ্মীর মনে দক্ষিণ দিকে বিষ্ণুর গমনের কারণ জানার কৌতূহল জেগে ওঠে। এরপর তিনিও বিষ্ণুর পিছু নেন। কিছু দূর এগোনোর পর সরষের খেতে ফুল ফুটে থাকতে দেখে, সেই ফুল দিয়ে লক্ষ্মী শৃঙ্গার করেন ও তার পর ফের এগিয়ে যান। কিছু দূর যাওয়ার পর আখের খেত থেকে আখ তুলে খান। সে সময় বিষ্ণু সেখানে আসেন ও লক্ষ্মীকে দেখে ক্ষুব্ধ হন।
এরপর বিষ্ণু লক্ষ্মীকে অভিশাপ দেন। বলেন, বারণ সত্ত্বেও লক্ষ্মী তাঁর পিছু নেন ও দরিদ্র কৃষকের খেত থেকে চুরির অপরাধ করে বসেন। লক্ষ্মীকে ১২ বছর পর্যন্ত কৃষকের সেবা করতে বলে ক্ষীরসাগরের উদ্দেশে প্রস্থান করেন বিষ্ণু। একবার লক্ষ্মী কৃষকের স্ত্রীকে স্নান করে লক্ষ্মী পুজো ও তার পর রান্না করার কথা বলেন। পুজোর পর কৃষক-পত্নীর সমস্ত মনস্কামনা পূর্ণ হবে বলে জানান লক্ষ্মী। কৃষক-পত্নী তেমনই করেন। ফল স্বরূপ দ্বিতীয় দিনই কৃষকের ঘর অন্ন, রত্ন, ধনে ভরে যায়। এভাবে ১২ বছর পর্যন্ত আনন্দে কাটে কৃষকের সময়। ১২ বছর পর বিষ্ণু লক্ষ্মীকে নিতে এলে কৃষকের স্ত্রী তাঁকে যেতে দেন না। তখন বিষ্ণু জানান, লক্ষ্মীকে কেউ যেতে দিতে চায় না। লক্ষ্মী চঞ্চলা, কোথাও টিকতে পারেন না।
তখন লক্ষ্মী ওই কৃষককে জানান, তাঁর কথা মতো চললে, পরিবারে কখনও অর্থাভাব থাকবে না। ধনতেরাসের দিনে ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করার কথা বলেন লক্ষ্মী। এর পর রাতে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে সন্ধাকালে পুজো করতে বলেন। লক্ষ্মী কৃষককে বলেন, একটি রুপোর ঘটে তাঁর জন্য টাকা ভরে রাখতে। তিনি সেই ঘটেই অবস্থান করবেন।
ধনতেরাসের প্রচারের উদ্দেশ্য
ধনতেরাস পালন করতে এই দিনে মূল্যবান ধাতু কেনার চল রয়েছে। সোনা-রুপোর দোকানেও ভিড় উপচে পড়ে। এছাড়াও পিতল, তামা-সহ অন্যান্য ধাতুর সামগ্রীও কেনা হয়। এই বাজার ধরতে ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচার করে। লোভনীয় অফারও দিয়ে থাকে। বাঙালিরা এই সংস্কৃতির বাইরে থাকলেও ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যেও এটা ঢুকে পড়ে। বছর কয়েক ধরে এই রাজ্যেও ধুমধাম করে ধনতেরাস পালিত হচ্ছে।
#Dhanteras #ধনতেরাস
Address
3721 2nd Street
Saltlake Sector V, Kolkata 700 091
Contacts
+91 98300 71925
Contract.subhendu.etv@gmail.com
