ভূত চতুর্দশী তো হচ্ছে, কিন্তু ভূতেরা সব গেল কোথায়?

হাউ মাউ খাউ, মানুষের গন্ধ পাউ। নাকি সুরে এভাবে ভয় দেখানোর কথা আর শোনা যায় না। এখন আর শ্যাওড়া গাছে শাকচুন্নি থাকে না। বেল গাছেও দেখা যায় না ব্রহ্মদৈত্যকে। রেললাইনের পাশ থেকে বিদায় নিয়েছে স্কন্ধ কাটা। পুকুর পাড়েও মাছের লোভে পথ আটকায় না মেছো ভূত। গুপী বাঘা-র ভূতের রাজাও নতুন প্রজন্মের মন থেকে আবছা হয়ে গিয়েছে। একজায়গায় জড়ো হয়ে ভূতের গুজব এখন আর খুব একটা হয় না। ভূতের বইয়ের বিক্রি অনেক কমে গিয়েছে। শুধুমাত্র ভূত চতুর্দশীর দিনেই স্মরণ করা হয় তেনাদের

কোথায় গেলো সব ভূত?

বলা হয়ে থাকে, আজকাল শহরে শ্যাওড়া গাছ কোথায়? বেলগাছের দেখাও তো মেলে না। নিরিবিলি পুকুরপাড়ই বা কোথায় আছে? না থাক। কলকাতায় তো পোড়ো বাড়ির অভাব নেই। নির্মীয়মান ফ্ল্যাটও রয়েছে। পুকুরপাড় না থাকুক বাইপাসের ধারে ভেড়ি তো আছে। মনে করা হয় অপঘাতে মৃত্যু থেকে ভূত হয়। এমন ধারণা থেকেই রেললাইনের কাছে ভূত থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেই হিসেবে তো মেট্রো স্টেশনেও ভূত থাকার কথা।

রাইটার্স বিল্ডিং, ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ভূত থাকা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু এই ক'বছরে কলকাতার বেশ কয়েকটি বহুতলে অগ্নিকাণ্ড বা পথ দুর্ঘটনাও ঘটেছে। অথচ সেখানেও এমন কোনও বিষয় নিয়ে কেউই ভাবে না। অন্তত ময়দানের ফাঁকা মাঠে একটা ভূতের রাজা থাকতেই পারতো। নেই, নেই কোথাও নেই। এইসব জায়গায় ভূত নিয়ে কোন চর্চাও হয় না। কেনও? এখান থেকে মুক্তি বা সরাসরি স্বর্গে যাওয়ার কোনও ছাড়পত্র আছে নাকি?

ভূতেদের নতুন প্রজন্ম বলে কিছু নেই? কালের নিয়মে কী ডাইনোসরদের মতনই ভূতেরা অবলুপ্ত হয়ে গেলো? তবে কিছু মানুষের যুক্তি ভুতেদের নতুন প্রজন্ম আছে। সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস, সর্টস, টিকটকে-র নিরাপদ জায়গায় নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। সেখানে তারা নাচ করে, গান গায়। ভয়ও দেখায়। যদিও এর কোনও সঠিক প্রমান পাওয়া যায়নি। অনেকেই এটাকে কল্পকাহিনী গালগল্প বলেই মনে করেন। তাঁদের মতে, মানুষের হাতে সময় এখন খুবই কম। বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডা, গল্প গুজব, কল্পকাহিনীর চাইতে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখেই বেশি সময় কাটান। অন্যরকম কিছু দেখলেই তার ব্যাখ্যা খুঁজতে সাহায্য নেন ইন্টারনেটে। সেখান থেকে বিজ্ঞানসম্মত কোন উত্তর খুঁজে পান তাঁরা। সেই উত্তরে ভৌতিক কোন বিষয়ক বা অপ্রাকৃতিক কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। চ্যাটজিপিটি বা গুগল এরকম কোন উত্তর-ও দেয় না। বর্তমান যুগের বাবা, মা, দাদু, দিদিমা, ঠাকুরদা বা ঠাকুমার কাছে ভুতের গল্পও শোনা যায় না। পড়াশোনার চাপে পাঠ্য পুস্তকের বাইরে ভূতের গল্প পড়া এখন বিলাসিতা। ভূতের সিনেমাতে ভূতের ভয়ের চাইতে কমেডি আর সেক্স বেশি দেখানো হয়। অবাধ্য বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণ করতে ভূতের ভয় দেখানোর চেয়ে হাতে মোবাইল ধরিয়ে দিলে দ্রুত কাজ হয়। সব মিলিয়ে বর্তমান প্রজন্মের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে ভূতেরা।

ভূতের কথা মনে পড়ে ভূত চতুর্দশীতে

বছরে একটা দিন মনে পড়ে তাদের কথা। কালীপুজোর আগের দিন ভূত চতুর্দশী।এদিন নাকি প্রেতাত্মারা পৃথিবীতে আসে। মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে বাবাজি, গুরুজী, তান্ত্রিকদের এই দিন নিয়ে বিশেষ ভাষণ। সন্ধ্যাবেলায় ১৪ প্রদীপ জ্বালানো হয়। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ভূত নিয়ে কিছু জোকস ফরওয়ার্ড করা, রিলসে কিছু ভূতের মজার ভিডিও আপলোড করা হয়।

কুমোড়টুলির কিছু শিল্পী এখনো ভূত বাঁচিয়ে রেখেছেন

একটা সময়ে মানুষকে ভূতে ধরতো। ওঝা এসে সরষে পোড়া দিয়ে সেই ভূত নামাতো। এখন আর সেই ভূতও নেই তাই ওঝার প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। তবে সারা বছর না হোক কয়েকটা দিন বোতল থেকে তাঁদের বের করা হয়। কুমোরটুলির কিছু অখ্যাত শিল্পী কালী পুজোর সময় ভুতেদের নিয়ে আসে। সেখান থেকেই তারা ছড়িয়ে পড়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। ডাকিনী যোগিনী ছাড়াও সাহেব, বড়বউ, মেছো, স্কন্ধ কাটা, ব্রহ্মদৈত্য থেকে বর্তমান প্রজন্মের এআই ভূত কিছুদিনের জন্য সবাইকে এনে হাজির করা হয়। কালীপুজো কমিটি সেগুলো কিনে নিয়ে যায়। পুজা মণ্ডপে বা তার আশেপাশে রাখা হয়। আর এই ভূতই হয় পুজোর বিশেষ আকর্ষণ।

#ভূত_চতুর্দশী #কলকাতার_ভূত #ভূতের_গল্প

Address

3721 2nd Street
Saltlake Sector V, Kolkata 700 091

Contacts

+91 98300 71925
Contract.subhendu.etv@gmail.com